শিক্ষা

গণদেবতা: শিবকালীপুর গ্রামের ভাঙন ও অধিকার আদায়ের মহাকাব্য

EliussRose
EliussRose
5 0 0
গণদেবতা: শিবকালীপুর গ্রামের ভাঙন ও অধিকার আদায়ের মহাকাব্য
সারসংক্ষেপ: পটভূমি ও রূপান্তর: বিশ শতকের শুরুর দিকে আধুনিকতার ছোঁয়ায় ‘শিবকালীপুর’ গ্রামের শত বছরের পুরনো চণ্ডীমণ্ডপ-কেন্দ্রিক সমাজ ও সামন্ততান্ত্রিক গ্রামীণ অর্থনীতি (জজমানি প্রথা) ভেঙে পড়তে শুরু করে।

১. ফাটলের শুরু
কার্তিক মাসের সকাল। কুয়াশার পাতলা চাদরটা তখনও শিবকালীপুর গ্রামের তালগাছগুলোর মাথায় আটকে আছে। কিন্তু গ্রামের চণ্ডীমণ্ডপের চত্বরটা এর মধ্যেই উত্তপ্ত।
অনিরুদ্ধ কামার তার নেহাইয়ের ওপর হাতুড়িটা আছড়ে ফেলে বলল, "আমি আর ধান নেব না গিরীশ। খাজনা যখন টাকায় দিতে হয়, তখন কামারশালার খাটুনির দামও আমি নগদ টাকায় নেব। বিঘে প্রতি তিন কাঠা ধানে আমার কয়লার দাম ওঠে না, পেটের ভাত তো দূর।"
গিরীশ ছুতোর একটা কাঠের তক্তা চাঁছতে চাঁছতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে অনিরুদ্ধের চেয়ে বয়সে বড়, চুলে পাক ধরেছে। বলল, "বাপ-ঠাকুরদার আমল থেকে জজমানি প্রথা চলে আসছে রে অনিরুদ্ধ। চাষী ধান দেবে, আমরা তাদের লাঙলের ফাল গড়ে দেব, ঘর ছেয়ে দেব। এই তো নিয়ম। নিয়ম ভাঙলে গাঁয়ে লক্ষ্মী থাকবে না।"
"লক্ষ্মী তো আগেই বিদায় হয়েছে গিরীশদা," অনিরুদ্ধ তামাকের কল্কেতে টান দিয়ে ক্ষোভ উগরে দিল। "চাষীদের ঘরে ধান থাকলে তো দেবে? অর্ধেক ধান তো খলা থেকেই ছেনো পালের গুদামে চলে যায় কর্জের সুদে। আর বাকিটা নেয় জমিদারের নায়েব। আমাদের পাওনা দেওয়ার সময় তাদের হাত কাঁপে।"
দূর থেকে দেবু পণ্ডিত আসছিল। কাঁধে একটা মলিন চাদর, পরনে খাটো ধুতি। গ্রামের পাঠশালার শিক্ষক সে, কিন্তু শিবকালীপুরের যে কোনো ভালো-মন্দের বিচার বা সালিশে দেবুই ভরসা। অনিরুদ্ধের চড়া গলা শুনে সে পা চালিয়ে এগিয়ে এল।
"কী হয়েছে অনিরুদ্ধ? সকাল সকাল এত রাগ কেন?" দেবু শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল।
অনিরুদ্ধ দেবুকে শ্রদ্ধা করে। সে একটু নরম হয়ে বলল, "পণ্ডিত মশাই, আপনিই বিচার করুন। তিন মাইল দূরে জংশন শহরে যে নতুন চালের কল বসেছে, সেখানে কামাররা দিনে বারো আনা, এক টাকা মজুরি পাচ্ছে নগদ। আর আমি সারা বছর খাটার পর চাষীদের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে ধানের জন্য হাত পাতব? তাও সে ধান কুড়ো আর চিটেয় ভরা! আমি সাফ বলে দিয়েছি, নগদ পয়সা না দিলে এ বছর কারও লাঙল আমি ধার দেব না।"
দেবু মণ্ডপের চাতালে বসল। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ। সে বুঝতে পারছিল, অনিরুদ্ধ একা নয়, ভেতরের আগুনটা পুরো গ্রামের। জংশনের ওই ধোঁয়া ওড়ানো কলটা শুধু চাল ছাঁটছে না, শিবকালীপুরের পুরনো সমাজটাকেও গুঁড়ো করে দিচ্ছে।
ঠিক এই সময় চণ্ডীমণ্ডপের সামনে এসে দাঁড়াল শ্রীহরি পাল। গ্রামের মানুষ তাকে 'ছেনো পাল' বলেই চেনে। ইদানীং চটের ব্যবসা আর সুদের কারবার করে সে ফেঁপেফুলে উঠেছে। জমিদারের নায়েবের সঙ্গে তার দহরম-মহরম। পরনে তার কোঁচানো ধুতি, কাঁধে চাদর, পায়ে চকচকে পাম্পশু।
শ্রীহরি পান চিবোতে চিবোতে বলল, "কী হে অনিরুদ্ধ, শুনলাম জজমানি মানবে না? গাঁয়ের চাষীদের লাঙল মেরামত করবে না?"
অনিরুদ্ধ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, "হ্যাঁ করব না। খাটুনির ন্যায্য দাম না পেলে করব না।"
"তাহলে গাঁয়ে থাকাও হবে না," শ্রীহরি চোখ রাঙিয়ে বলল। "জমিদারের জমিতে ঘর তুলে বাস করছ, সেটা মনে থাকে যেন? সমাজ ভাঙতে এলে সমাজ তোমাকে একঘরে করবে। বলি পণ্ডিত, তুমি তো গাঁয়ের হিতাকাঙ্ক্ষী, তুমি কিছু বলছ না যে?"
দেবু পণ্ডিত সোজা হয়ে দাঁড়াল। শ্রীহরির এই ঔদ্ধত্য সে সহ্য করতে পারে না। বলল, "শ্রীহরি, অনিরুদ্ধ অন্যায় কিছু বলেনি। বাজারে কাপড়ের দাম বেড়েছে, তেলের দাম বেড়েছে। কিন্তু চাষীদের থেকে পাওয়া ধানের পরিমাণ একই আছে। সমাজ যদি তাদের পেটের ভাত দিতে না পারে, তবে সেই সমাজ টিকবে কী করে?"
শ্রীহরি কুটিল হাসল। "বেশ, তোমরা তবে সমাজ ভাঙো। আমিও দেখে নেব, ছেনো পালের কথার বাইরে গিয়ে শিবকালীপুরে কে লোহা পিটায় আর কে পাঠশালা চালায়।"
২. রথের চাকা এবং ভাতের লড়াই
দিন কয়েকের মধ্যেই শ্রীহরির কথার খেসারত দিতে হলো গ্রামকে। অগ্রহায়ণের ধান কাটা শুরু হয়েছে। মাঠে মাঠে সোনালী ফসল। কিন্তু চাষীদের মনে আনন্দ নেই। অনিরুদ্ধের কামারশালা বন্ধ। লাঙলের ফাল ভেঙে পড়ে আছে, কাস্তেগুলো ভোঁতা।
শ্রীহরি জংশন শহর থেকে দুজন নতুন কামার আর ছুতোর নিয়ে এল। তারা নগদ টাকায় কাজ করছে, কিন্তু শুধু শ্রীহরি আর তার অনুগত বড় বড় চাষীদের। প্রান্তিক চাষী আর বাউরিদের জন্য তাদের সময় নেই।
পাতু বাউরি সারাদিন মাঠে খেটে সন্ধ্যায় দেবু পণ্ডিতের চণ্ডীপুরের বাড়িতে এসে বসল। তার চোখ দুটো কোটরে বসা।
"পণ্ডিত মশাই, একটা হিল্লে করে দিন," পাতু কেঁদে ফেলল। "চাষের জমিতে খাটলাম, কিন্তু ছেনো পাল বলে দিয়েছে, গত বছরের কর্জের দায়ে আমার ভাগের সব ধান তার গোলায় উঠবে। আমার পোলাপানগুলা না খেয়ে মরবে গো।"
দেবু পাতুর পিঠে হাত রাখল। তার নিজের ঘরেও অন্নকষ্ট। পাঠশালার সামান্য কটা টাকায় সংসার চলে না। তার ওপর বিলু, তার স্ত্রী, অসুস্থ। কিন্তু দেবু নিজের দুঃখ ভুলে পাতুর দিকে তাকাল।
"পাতু, অধৈর্য হয়ো না। কাল ভোরে আমরা সবাই মিলে জমিদারের কাছারিতে যাব। নায়েব মশাইকে বলব, যেন এই দুর্ভিক্ষের বছরে কর মকুব করা হয়, অথবা ছেনো পালের অত্যাচার বন্ধ করা হয়।"
পরদিন সকালে দেবু পণ্ডিতের নেতৃত্বে একদল মানুষ কাছারি বাড়ির দিকে রওনা হলো। অনিরুদ্ধ, গিরীশ, পাতু বাউরি এবং আরও কয়েকজন চাষী ছিল দলে। কিন্তু কাছারি বাড়িতে গিয়ে তারা যা দেখল, তার জন্য প্রস্তুত ছিল না।
নায়েব মশাইয়ের পাশে জাঁকিয়ে বসে আছে শ্রীহরি পাল। তার হাতে একটা খাতা।
দেবু বিনীতভাবে বলল, "নায়েব মশাই, গাঁয়ের মানুষ বড় বিপদে পড়েছে। অনিরুদ্ধের কামারশালা বন্ধ হওয়ায় চাষের ক্ষতি হচ্ছে। তার ওপর শ্রীহরি বাবু কর্জের নামে গরিবদের সব ধান কেড়ে নিচ্ছেন। এবার খাজনা কিছুটা মকুব না করলে মানুষ না খেয়ে মরবে।"
নায়েব মশাই নস্যি নিয়ে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন। "পণ্ডিত, তুমি তো দেখছি দিন দিন বাগী হয়ে উঠছ। প্রজাদের ওসব ওজর-আপত্তি শুনলে জমিদারের এস্টেট চলবে না। আর ছেনো পালের কথা বলছ? সে তো জমিদারের বকেয়া খাজনা নিজের পকেট থেকে শোধ করে দিয়েছে। এই শিবকালীপুরের চণ্ডীমণ্ডপসহ চারপাশের চরের জমি এখন শ্রীহরির জিম্মায়।"
দেবু স্তব্ধ হয়ে গেল। শ্রীহরি পালের দিকে তাকাতেই দেখল, তার মুখে এক পৈশাচিক জয়ের হাসি।
"হ্যাঁ পণ্ডিত," শ্রীহরি খাতাটা চাপড়ে বলল। "আইন মেনে সব হয়েছে। এখন থেকে চণ্ডীমণ্ডপে বসতে হলে আমার অনুমতি লাগবে। আর অনিরুদ্ধ, তোমার বসতভিটার খাজনা বাকি। আগামী সপ্তাহের মধ্যে টাকা না দিলে ভিটে থেকে উচ্ছেদ করা হবে।"
অনিরুদ্ধ লাঠিটা উঁচিয়ে চিৎকার করে উঠল, "ছেনো পাল! তোর এত বড় বাড় বেড়েছে? তোর বাপও তো এই মণ্ডপের নিচে বসে তামাক সেজেছে। আজ তুই আমাদের ভিটে ছাড়া করবি?"
"খবরদার অনিরুদ্ধ!" নায়েবের পেয়াদা লাঠি নিয়ে তেড়ে এল।
দেবু অনিরুদ্ধকে টেনে ধরল। "শান্ত হও অনিরুদ্ধ। এখানে শক্তি দিয়ে হবে না। চল।"
ফিরে আসার পথে কেউ কোনো কথা বলল না। শিবকালীপুরের আকাশ যেন আরও ধূসর হয়ে উঠেছিল। শত বছরের পুরনো যে চণ্ডীমণ্ডপ ছিল গ্রামের ঐক্য, আনন্দ আর উৎসবের কেন্দ্র, আজ তা এক মহাজনের সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে।
৩. ভাঙন ও আগুন
শীতের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে শিবকালীপুরের ভেতরের যন্ত্রণাটা আরও তীব্র হলো। শ্রীহরি পাল এখন গ্রামের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। সে জমিদারের কাছ থেকে চণ্ডীমণ্ডপ সংস্কারের নাম করে লিজ নিয়েছে এবং সেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষেধ করে দিয়েছে।
বাউরি পাড়ায় কলেরা দেখা দিল। চিকিৎসার অভাব, খাদ্যের অভাব। দেবু পণ্ডিত তার পাঠশালা বন্ধ করে দিনরাত রোগীদের সেবা করতে লাগল। নিজের অসুস্থ স্ত্রী বিলু আর ছোট সন্তানকে ঘরে রেখে সে ছুটে চলল পাতু বাউরির কুঁড়েঘরে, কখনো বা মুচি পাড়ায়।
অনিরুদ্ধ কামার আর গ্রামে টিকতে পারল না। এক রাতে সে তার বউ পদ্মকে নিয়ে নিঃশব্দে গ্রাম ছেড়ে জংশন শহরের দিকে চলে গেল। যাওয়ার আগে দেবুর সাথে দেখা করে চোখের জল ফেলে বলেছিল, "পণ্ডিত মশাই, মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ছেনো পাল আমার নেহাই আর হাতুড়িটা পর্যন্ত ক্রোক করেছে। জংশনের কলেই খাটব। সমাজ আমাদের রাখল না।"
অনিরুদ্ধের চলে যাওয়াটা দেবুর বুকে তীরের মতো বিঁধল। একটা একটা করে ইট খসে পুরো বাড়িটা যেভাবে ধসে পড়ে, শিবকালীপুর গ্রামটাও সেভাবে ভেঙে যাচ্ছে।
এরই মধ্যে একদিন ঘটল সেই চূড়ান্ত বিপর্যয়।
শীতের এক রাতে বাউরি পাড়া থেকে চিৎকার ভেসে এল। আগুন! আগুন লেগেছে পাতু বাউরির ঘরে।
দেবু পণ্ডিত ঘর থেকে লণ্ঠন নিয়ে ছুটে গেল। পুরো বাউরি পাড়া তখন দাউদাউ করে জ্বলছে। শুকনো খড়ের চালগুলো মুহূর্তের মধ্যে আগুনের গ্রাসে চলে গেল। আগুনের আলোয় দেখা গেল, দূর থেকে শ্রীহরি পালের কয়েকজন লাঠিয়াল ঘোড় সওয়ার হয়ে চলে যাচ্ছে।
"সব পুড়ে গেল রে পণ্ডিত মশাই! ছেনো পাল আমাদের উচ্ছেদ করে দিল!" পাতু বাউরি মাটিতে আছড়ে পড়ে কাঁদছিল। শ্রীহরি চেয়েছিল ওই জমিতে নিজের নতুন ধানের গুদাম বানাতে, আর বাউরিরা জমি ছাড়ছিল না বলেই এই নৃশংসতা।
দেবু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে আগুনের শিখার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল, "এ আগুন শুধু বাউরি পাড়ায় লাগেনি পাতু। এ আগুন পুরো শিবকালীপুরকে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে। কিন্তু অন্যায়কারী টিকবে না।"
সারা রাত ধরে আগুন নেভানোর পর ক্লান্ত, ধূলিধূসরিত দেবু যখন পরদিন সকালে নিজের বাড়ি ফিরল, তখন তার জন্য অপেক্ষা করছিল আরও বড় আঘাত।
তার ঘরের দাওয়ায় বসে কাঁদছে গ্রামের কয়েকজন মহিলা। ঘরের ভেতর থেকে বিলুর গোঙানির শব্দ আসছে না। দেবু দ্রুত ঘরে ঢুকল। কলেরার প্রকোপ তার নিজের ঘরেও হানা দিয়েছে। তার চার বছরের ফুটফুটে সন্তানটি বিছানায় নিস্পন্দ পড়ে আছে, আর বিলুর চোখ দুটো আধবোজা, জীবনপ্রদীপ শেষের পথে।
দেবু তার সন্তানের চাদরটা টেনে নিল। তার চোখ দিয়ে জল পড়ল না, কেবল এক অদ্ভুত শূন্যতা আর পাথর চাপা কষ্ট তাকে গ্রাস করল। বিলু কোনোমতে হাতটা বাড়িয়ে দেবুর হাতটা ধরল। বলল, "ওদের বাঁচাও... গ্রামের মানুষদের..." সেটাই ছিল বিলুর শেষ কথা।
একই দিনে দেবু তার স্ত্রী, সন্তান এবং নিজের অতীতকে হারিয়ে ফেলল।
৪. নতুন সূর্য
সব হারিয়ে দেবু পণ্ডিত যখন শ্মশান থেকে ফিরল, তখন সে আর আগের সেই শান্ত পাঠশালার শিক্ষক নয়। তার চোখে এখন এক ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা আগুন।
গ্রামের মানুষ ভেবেছিল দেবু হয়তো এবার ভেঙে পড়বে, সন্ন্যাসী হয়ে যাবে বা অনিরুদ্ধের মতো শহর চলে যাবে। কিন্তু দেবু শিবকালীপুর ছাড়ল না। সে বাউরি পাড়ার পুড়ো ভিটেতে গিয়ে দাঁড়াল। তার চারপাশে এসে জড়ো হলো সর্বস্বান্ত গিরীশ ছুতোর, ঘরহারা পাতু বাউরি, আর গ্রামের শোষিত চাষীরা।
শ্রীহরি পাল তখন চণ্ডীমণ্ডপের সামনে দাঁড়িয়ে নতুন পাহারাদার বসাচ্ছে। সে ভাবেনি দেবু আবার ঘুরে দাঁড়াবে।
দেবু চণ্ডীমণ্ডপের সামনে এসে দাঁড়াল। তার পেছনে পুরো গ্রামের জনস্রোত—যাদের জমি কেড়ে নেওয়া হয়েছে, যাদের ঘর পোড়ানো হয়েছে।
শ্রীহরি হেসেই বলল, "কী হে পণ্ডিত? পাঠশালা তো বন্ধ, বউ-ছেলেও নেই। এখন এখানে কেন? মাথা গোঁজার ঠাঁই চাই বুঝি?"
দেবু শান্ত কিন্তু বজ্রকঠিন গলায় বলল, "শ্রীহরি পাল, তুমি ভেবেছ টাকা আর লাঠিয়াল দিয়ে এই চণ্ডীমণ্ডপটা কিনলেই তুমি শিবকালীপুরের মালিক হয়ে গেলে? এই মণ্ডপের প্রতিটা ধূলিকণায় আমাদের পূর্বপুরুষদের ঘাম আর রক্ত মিশে আছে।"
"আইন আমার পক্ষে পণ্ডিত!" শ্রীহরি চিৎকার করে উঠল।
"আইন তোমার পক্ষে হতে পারে, কিন্তু 'গণ' আমাদের পক্ষে," দেবু পেছনের জনতার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। "এই যে পাতু বাউরি, গিরীশ ছুতোর, রহমত শেখ—এরা একেকজন এই গ্রামের স্তম্ভ। তুমি এদের ঘর পুড়িয়েছ, কিন্তু এদের ভেতরের বাঁচার লড়াইটাকে পোড়াতে পারোনি। আজ থেকে আমরা তোমার কোনো হুকুম মানব না। জংশনের কলে আমরা ধান দেব না। আমরা নিজেদের ফসল নিজেরা রক্ষা করব।"
পেছন থেকে পাতু বাউরি গর্জে উঠল, "হেই রে রে! পণ্ডিত মশাইয়ের জয়!" পুরো জনতা একসাথে চিৎকার করে উঠল। সেই চিৎকারে শ্রীহরি পালের লাঠিয়ালরা পর্যন্ত ভয় পেয়ে দু-পা পিছিয়ে গেল। শ্রীহরি বুঝতে পারল, এতদিনের চেনা, অবদমিত গ্রামটা আর নেই। তারা এখন একতাবদ্ধ।
দেবু বুঝতে পারছিল, লড়াইটা দীর্ঘ হবে। অনিরুদ্ধরা হয়তো শহরে গেছে, কিন্তু তারা আবার ফিরবে। গ্রামীণ সমাজের পুরনো জজমানি প্রথার অবসান হয়তো অবশ্যম্ভাবী, কিন্তু তার জায়গায় শোষকের শাসন চলতে দেওয়া যায় না। নতুন দিনে নতুনভাবে অধিকারের লড়াই লড়তে হবে।
কুয়াশা কেটে সূর্য উঠছে। সেই নতুন সূর্যের আলোয় দেবু পণ্ডিতের মুখটা দীপ্ত দেখাচ্ছিল। শিবকালীপুরের চণ্ডীমণ্ডপ আজ আর কেবল একটা জরাজীর্ণ দালান নয়, তা হয়ে উঠেছে হাজারো লাঞ্ছিত মানুষের অধিকার আদায়ের এক নতুন প্রতীক—যেখানে দেবতা নয়, জাগ্রত হয়েছে স্বয়ং 'গণদেবতা'।

মন্তব্য (0)

এখনো কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!