শিক্ষা

পঞ্চগ্রাম: পাঁচ গ্রামের কান্না ও দেবু পণ্ডিতের অধিকারের লড়াই

EliussRose
EliussRose
4 0 0
পঞ্চগ্রাম: পাঁচ গ্রামের কান্না ও দেবু পণ্ডিতের অধিকারের লড়াই
সারসংক্ষেপ: গণশক্তির রূপান্তর: গ্রামীণ কৃষকদের ঐতিহ্যবাহী আন্দোলন হয়তো সামন্তপ্রভু ও ব্রিটিশ শক্তির কাছে পরাজিত হয়েছিল, কিন্তু সেই পরাজয়ের মাঝেই জন্ম নেয় আধুনিক শ্রমিক আন্দোলনের চেতনা। দেবু পণ্ডিতের ত্যাগ ও আদর্শ পঞ্চগ্রামের সীমানা পেরিয়ে এক বৃহত্তর গণ-আন্দোলনের রূপ নেয়।

. চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের নতুন মরণফাঁদ
শিবকালীপুরের চণ্ডীমণ্ডপকে কেন্দ্র করে গণমানুষের যে জাগরণ ঘটেছিল, তা সাময়িকভাবে থমকে গেছে। শোষক শ্রীহরি পাল এখন আরও শক্তিশালী। সে এখন আর শুধু মহাজন নয়, জমিদারের পত্তনিদার বা ছোট জমিদার 'শ্রীহরি রায়'। পঞ্চগ্রামের বিস্তীর্ণ মাঠের ওপর এখন তার শকুন-দৃষ্টি।
ঠিক এই সময়ে বাংলার কৃষিজীবী সমাজের ওপর নেমে এল এক নতুন অভিশাপ—জমি জরিপ বা 'সেটেলমেন্ট'। ১৯৫০-এর দশকের আগেই ব্রিটিশ ভারতের এই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের শেষ কামড় কৃষকদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছিল। সরকারি কর্মচারীরা মাঠে মাঠে গিয়ে জমি মেপে নতুন খতিয়ান তৈরি করছে। কিন্তু এই জরিপের মারপ্যাঁচে শত বছর ধরে চাষ করে আসা কৃষকেরা তাদের জমির স্বত্ব হারাতে বসল। সামান্য ভুলের কারণে একজনের জমি চলে যাচ্ছে অন্যের নামে, আর সেই সুযোগে শ্রীহরি পাল টাকার জোরে জাল দলিল বানিয়ে গরিবদের জমি নিজের গোলায় পুরছে।
পঞ্চগ্রামের বিস্তীর্ণ মাঠে অগ্রহায়ণের ধান পেকেছে। কিন্তু কুসুমপুর গ্রামের মুসলিম চাষী রহমত শেখ কিংবা শিবকালীপুরের বাউরি পাড়ার পাতুর মনে কোনো আনন্দ নেই। তারা জানে, মাঠের ফসল এবার তাদের ঘরে উঠবে না।
রহমত শেখ একদিন সন্ধ্যায় দেবু পণ্ডিতের কুটিরে এসে বসল। দেবু এখন সম্পূর্ণ একা। কলেরায় স্ত্রী বিলু আর একমাত্র সন্তানকে হারানোর পর তার ঘর শূন্য। সে এখন বাউরি পাড়ার একটা ভাঙা ঘরে থাকে। পাঠশালা বন্ধ, কিন্তু পঞ্চগ্রামের মানুষের সুখ-দুঃখের পাঠশালা সে একাই চালায়।
রহমত বলল, "পণ্ডিত মশাই, সেটেলমেন্টের বাবুরা আমার পৈতৃক তিন বিঘা জমি শ্রীহরি পালের নামে লিখে দিয়েছে। বলছে, খাজনার রসিদ নাকি শ্রীহরির নামে কাটা। এখন আমি কী করব? না খেয়ে মরব?"
দেবু খতিয়ানের কাগজটা প্রদীপের আলোয় দেখল। তার কপালে চিন্তার গভীর ভাঁজ। সে বুঝতে পারছিল, শ্রীহরি একা নয়, পুরো ব্রিটিশ আইনি ব্যবস্থাটাই গরিবের রক্ত চোষার জন্য তৈরি। দেবু রহমতের পিঠে হাত রেখে বলল, "লড়াই করতে হবে রহমত ভাই। শুধু তুমি নও, পঞ্চগ্রামের হাজারো চাষীর জমি আজ এই জরিপের ফেরে পড়ে বেদখল হয়ে যাচ্ছে। আমাদের আইনি লড়াই লড়তে হবে।"
২. পঞ্চগ্রামের সমাজ-রাজনীতি ও দেবুর একাকীত্ব
দেবু পণ্ডিত পঞ্চগ্রামের কৃষকদের সংগঠিত করার সিদ্ধান্ত নিল। শিবকালীপুর, কুসুমপুর, মহাদেবপুর, ডেঁগোয়া ও কুড়মুড়ে—এই পাঁচ গ্রামের মানুষের জীবন একে অপরের সাথে বাঁধা। শিবকালীপুরে যদি কামারশালা বন্ধ হয়, তবে কুসুমপুরের চাষীর লাঙল চলে না; আবার কুড়মুড়ের হাটে যদি ফসল না ওঠে, তবে মহাদেবপুরের তাঁতিদের ঘরে অন্ন জোটে না।
কিন্তু এই পাঁচ গ্রামকে এক করা এত সহজ ছিল না। শ্রীহরি পাল চাল চালল। সে কুসুমপুরের মুসলিম চাষীদের উস্কানি দিল শিবকালীপুরের হিন্দু বাউরিদের বিরুদ্ধে। সাম্প্রদায়িকতার বীজ বুনে সে পঞ্চগ্রামের ঐক্য ভাঙার চেষ্টা করল। রহমত শেখের মতো বিচক্ষণ মানুষেরা দেবুর পাশে থাকলেও, অনেক সাধারণ মানুষ শ্রীহরির ফাঁদে পা দিল।
এরই মধ্যে দেবুর ব্যক্তিগত জীবনে এক নতুন ঝড়ের আভাস দিল। অনিরুদ্ধ কামারের স্ত্রী পদ্ম জংশন শহর থেকে গ্রামে ফিরে এসেছে। অনিরুদ্ধ শহরে গিয়ে মিলের কুলি হয়েছে, মদে আসক্ত হয়ে পড়েছে এবং পদ্মর কোনো খোঁজ নেয় না। পদ্ম গ্রামে ফিরে দেবুর কুটিরে আশ্রয় চাইল। দেবু তাকে বোনের মতো আশ্রয় দিল, কিন্তু রক্ষণশীল গ্রামীণ সমাজ তা মেনে নিল না।
শ্রীহরি পাল রটিয়ে দিল, "পণ্ডিতের চরিত্র নষ্ট হয়েছে। সে পরস্ত্রীকে ঘরে রেখেছে।" এমনকি দুর্গা, যে বাউরি পাড়ার মেয়ে এবং দেবুকে মনে মনে শ্রদ্ধা করত, সেও পদ্মর আগমনে কিছুটা ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ল। কিন্তু দেবু এই সমস্ত সামাজিক কুৎসার ঊর্ধ্বে গিয়ে মানুষের জন্য কাজ করে গেল। সে জানত, তার হারানোর আর কিছু নেই।
৩. খাজনা বন্ধ আন্দোলন ও চরের যুদ্ধ
উপন্যাসের মূল সংঘাত শুরু হয় যখন শ্রীহরি রায় (পাল) পঞ্চগ্রামের ওপর অতিরিক্ত খাজনা এবং জরিপের ফি ধার্য করে। কৃষকদের পক্ষে সেই টাকা দেওয়া অসম্ভব ছিল।
দেবু পণ্ডিত পাঁচ গ্রামের এক বিরাট সভা ডাকল মহাদেবপুরের মাঠে। সেখানে হিন্দু, মুসলমান, বাউরি, মুচি, চাষী—সবাই সমবেত হলো। দেবু মঞ্চে দাঁড়িয়ে বজ্রকণ্ঠে বলল, "যে জমি আমাদের মায়ের মতো, যে জমিতে আমাদের ঘাম আর রক্ত মিশে ফসল ফলে, সেই জমির খাজনা আমরা দেব না যতক্ষণ না পর্যন্ত অন্যায় জরিপ বাতিল হচ্ছে। পঞ্চগ্রামের মানুষ আর শ্রীহরি পালের গোলামি করবে না।"
শুরু হলো ঐতিহাসিক 'খাজনা বন্ধ আন্দোলন'। পঞ্চগ্রামের কোনো চাষী শ্রীহরির কাছারিতে গিয়ে খাজনা দিল না। শ্রীহরি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। সে জংশন শহর থেকে পুলিশ এবং পেশাদার লাঠিয়াল নিয়ে এল।
ঠিক এই সময়ে কোপাই নদীর চরে এক বিরাট নতুন জমি (চর) জেগে উঠল। এই উর্বর চরের জমির দখল নিয়ে পঞ্চগ্রামের ভাগ্য নির্ধারিত হওয়ার কথা। শ্রীহরি চরের জমি নিজের নামে লিজ নিল এবং জংশনের কলকারখানার মালিকদের কাছে তা চড়া দামে বিক্রি করার চক্রান্ত করল। কিন্তু পঞ্চগ্রামের ভূমিহীন বাউরি ও সাঁওতালরা, যাদের ঘরবাড়ি উচ্ছেদ করা হয়েছিল, তারা পাতু বাউরির নেতৃত্বে চরের জমি দখল করতে গেল।
এক অমাবস্যার রাতে চরের বুকে নেমে এল অন্ধকার। শ্রীহরির লাঠিয়াল বাহিনী বন্দুক আর লাঠি নিয়ে আক্রমণ করল নিরস্ত্র বাউরিদের ওপর। পাতু বাউরি বীরের মতো লড়াই করল, কিন্তু বন্দুকের গুলির সামনে লাঠি কতক্ষণ টেকে? চরের বালি বাউরিদের রক্তে রাঙা হয়ে উঠল। পাতু গুরুতর আহত হলো এবং অনেককে বন্দি করা হলো।
খবর পেয়ে দেবু পণ্ডিত যখন চরে পৌঁছাল, তখন চারদিকে শুধু আর্তনাদ। শ্রীহরি পালের পুলিশ দেবুকেও রেহাই দিল না। আন্দোলন উস্কে দেওয়ার অপরাধে এবং রাজদ্রোহের অভিযোগে দেবু পণ্ডিতকে আবার গ্রেফতার করা হলো।
৪. ভাঙন, পরাজয় নাকি নতুন রূপান্তর?
পঞ্চগ্রাম উপন্যাসের শেষ অধ্যায়গুলো অত্যন্ত বেদনাবিধুর এবং বাস্তবসম্মত। তারাশঙ্কর এখানে সস্তা কোনো রূপকথার জয় দেখাননি, বরং দেখিয়েছেন এক রূঢ় ঐতিহাসিক সত্যকে।
দেবু পণ্ডিতের পাঁচ বছরের জেল হলো। দেবুর অনুপস্থিতিতে পঞ্চগ্রামের আন্দোলন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। শ্রীহরি পাল তার চূড়ান্ত বিজয় উদযাপন করল। সে আইনি মারপ্যাঁচে রহমত শেখের জমি কেড়ে নিল। রহমত বাধ্য হয়ে সপরিবারে দেশান্তরী হলো। বাউরি পাড়া সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে গেল; অনেকে পেটের দায়ে জংশন শহরের কারখানায় কুলি হতে চলে গেল। গ্রামীণ সমাজের যে যৌথ চেতনা, যে স্বনির্ভরতা ছিল, তা চিরতরে বিলুপ্ত হলো। জংশন শহরের পুঁজিবাদ আর কলকারখানার ধোঁয়া গ্রামীণ সংস্কৃতির শেষ চিহ্নটুকুও গ্রাস করে নিল।
পাঁচ বছর পর দেবু পণ্ডিত যখন জেল থেকে ছাড়া পেয়ে পঞ্চগ্রামে ফিরল, তখন সে এক বুড়ো, ক্লান্ত মানুষ। শিবকালীপুর বা কুসুমপুরে আগের সেই চেনা মুখগুলো আর নেই। অনিরুদ্ধ শহরের বস্তিতে মারা গেছে, পদ্ম নিখোঁজ। গিরীশ ছুতোর অন্ধ হয়ে ভিক্ষা করছে। চণ্ডীমণ্ডপটি এখন শ্রীহরি রায়ের সুরম্য প্রাসাদের তোরণ মাত্র।
দেবু তার ভাঙা কুটিরের সামনে গিয়ে বসল। চারদিকে শুধু ধ্বংসস্তূপ আর নীরবতা। পঞ্চগ্রামের যে আন্দোলনের স্বপ্ন সে দেখেছিল, তা বাহ্যিকভাবে পরাজিত হয়েছে।
কিন্তু ঠিক তখনই দেবুর কাছে এসে দাঁড়াল দুর্গা। দুর্গা এখন আর সেই চঞ্চল তরুণী নয়, সে এখন এক পরিণত নারী, যে দেবুর আদর্শকে মনে মনে বাঁচিয়ে রেখেছে। দুর্গা দেবুর হাতে কিছু টাকা তুলে দিয়ে বলল, "পণ্ডিত মশাই, আপনি হেরে যাননি। শ্রীহরি রায় জমি কেড়ে নিতে পেরেছে, কিন্তু মানুষের মনের ভেতর আপনি যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের বীজ বুনে দিয়েছেন, তা মরেনি। জংশনের কারখানায় যে ছেলেরা খাটতে গেছে, তারা আজ মজুরি বাড়ানোর জন্য ধর্মঘট করছে। আপনার নাম করেই তারা লড়াই করছে।"
দেবু পণ্ডিত আকাশের দিকে তাকাল। পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবছে, কিন্তু তার আভা লাল করে দিয়েছে পুরো পঞ্চগ্রামের মাঠকে। দেবু বুঝতে পারল, সামন্ততান্ত্রিক গ্রামীণ সমাজব্যবস্থার পতন অবশ্যম্ভাবী ছিল। পুরনোর ধ্বংসের ওপরই নতুনের জন্ম হয়। শিবকালীপুর বা কুসুমপুরের সীমানা ছাড়িয়ে পঞ্চগ্রামের মানুষ আজ শহরের শ্রমিক শ্রেণীর সাথে মিশে গেছে। লড়াইয়ের মাঠ বদলেছে, কিন্তু লড়াই থামেনি।
সে ভাঙা কুটিরের দাওয়াত থেকে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে জল নেই, আছে এক গভীর তৃপ্তি। পঞ্চগ্রামের মাটি হয়তো আজ অন্য কারও দখলে, কিন্তু এই মাটির মানুষেরা যেখানেই যাবে, তারা শোষণের বিরুদ্ধে গর্জে উঠবে। দেবু পণ্ডিত হাসিমুখে দুর্গাকে বলল, "চল দুর্গা, নতুন দিনের আলো ফুটছে। আমাদের আবার কাজ শুরু করতে হবে।

মন্তব্য (0)

এখনো কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!